Shiraz,The Irani city of Poetry & Wine

আমি শিরাজ শহর নিয়ে আমার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। এই শহর শুধু ইরানের একটি ঐতিহাসিক শহর নয়, এটা যেন এক জীবন্ত কবিতা। এখানে ইতিহাস, কবিতা, বাগান, মানুষের উষ্ণতা—সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যা একজন ভ্রমণকারীর হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে যায়। শিরাজে হাফেজের কবিতা বাতাসে ভেসে বেড়ায়, বাগানগুলো যেন ফেরদৌসের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, আর মানুষের আতিথেয়তা এমন আন্তরিক যে মনে হয় আপনি একজন অতিথি নন, বরং তাদের নিজের মানুষ।

শিরাজ শহরে পৌঁছানোর মুহূর্তটা আজও মনে আছে, যেন ইতিহাসের বুকের ভেতর ঢুকে পড়েছি। ইরানের এই শহরের নাম শুনলেই আমার মনে প্রথমে ভেসে ওঠে দুইটা জিনিস—হাফেজ আর ওয়াইন। পৃথিবীর বহু শহর আছে, কিন্তু এমন শহর খুব কম যেখানে কবিতা আর মদ একই সঙ্গে ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি ইয়াজদ থেকে শিরাজে যাচ্ছিলাম একটা শেয়ার্ড ট্যাক্সিতে। মরুভূমির শহর ইয়াজদের সেই সরু রাস্তা, মাটির বাড়ি আর বাতাস ধরার টাওয়ারগুলো ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যাচ্ছিল, আর সামনে খুলে যাচ্ছিল পারস্যের আরেকটা অধ্যায়। গাড়ির ভেতরে আমরা চারজন ছিলাম—ড্রাইভার, আমি, আর দুজন স্থানীয় যাত্রী। বাইরে বিস্তীর্ণ মরুভূমি, মাঝে মাঝে পাহাড়ের রেখা, আর রোদের মধ্যে ধুলো উড়ে উঠছে। সেই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমার মনে হচ্ছিল আমি শুধু একটা শহর থেকে আরেকটা শহরে যাচ্ছি না, আমি যেন ইতিহাসের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। কারণ শিরাজ এমন একটা শহর যার নাম উচ্চারণ করলেই পার্সিয়ান কবিতা, গোলাপের বাগান আর ওয়াইনের গল্প মনে পড়ে। শত শত বছর আগে এখানকার ওয়াইন ছিল পৃথিবীর সেরা, আর এখানেই জন্মেছেন হাফেজ—যার কবিতা আজও পার্সিয়ান মানুষের হৃদয়ের ভেতর বেঁচে আছে।

শিরাজে পৌঁছানোর পর শহরটা আমাকে প্রথমেই এক অদ্ভুত অনুভূতি দিল। তেহরানের মতো কোলাহল নেই, ইয়াজদের মতো নিঃসঙ্গ মরুভূমিও নয়। এখানে একটা নরম ছন্দ আছে। রাস্তার পাশে সাইপ্রাস গাছ, পুরনো বাড়ি, ছোট ছোট বাগান। মনে হচ্ছিল শহরটা যেন কবিতার ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছে। আমার শিরাজে আসার আরেকটা কারণ ছিল—এখানে আমার এক মহিলা বন্ধু ছিল। আমরা অনেকদিন ধরে অনলাইনে কথা বলতাম। সে জানত আমি ইরান ভ্রমণ করছি, আর আমি তাকে বলেছিলাম একদিন শিরাজে পৌঁছাবো। কিন্তু তখন সে নিজের বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। তাই আমার মনে সন্দেহ ছিল আদৌ সে দেখা করতে পারবে কিনা।

প্রথম দুদিন আমি একাই শহরটা ঘুরলাম। এক সকালে খুব ভোরে আমি গেলাম বিখ্যাত পিঙ্ক মসজিদে—নাসির আল-মুলক মসজিদ। সূর্য তখন সবে উঠছে। মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই মনে হল আমি যেন আলো দিয়ে তৈরি এক জগতে ঢুকে পড়েছি। রঙিন কাঁচের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে ঢুকছে আর মেঝেতে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ অসংখ্য রঙের ছায়া পড়ছে। পুরো মসজিদের ভেতরটা যেন একটা জীবন্ত ক্যালাইডোস্কোপ। মানুষ চুপচাপ বসে সেই আলো দেখছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ শুধু তাকিয়ে আছে। আমি মেঝেতে বসে কিছুক্ষণ সেই আলো দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন এই আলো শুধু দেয়ালে পড়ছে না, মানুষের ভেতরেও ঢুকে যাচ্ছে। আমার পাশে বসা এক ইরানি ছেলে ধীরে ধীরে বলল, “এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সৌন্দর্যও এক ধরনের প্রার্থনা।”

পরে আমি আবার গেলাম হাফেজের সমাধিতে। শিরাজের মানুষের কাছে হাফেজ শুধু কবি না, তিনি যেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তার সমাধির চারপাশে একটা শান্ত বাগান, ফুলের গন্ধ, আর মানুষ চুপচাপ বসে আছে। কেউ তার কবিতার বই খুলে রেখেছে, কেউ চোখ বন্ধ করে বসে আছে। আমি দেখলাম এক বৃদ্ধ তার নাতনিকে বলছে, “হাফেজকে পড়লে মানুষের মন পরিষ্কার হয়ে যায়।”

আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজন তরুণ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোথা থেকে?”

আমি বললাম, “ইন্ডিয়া।”

সে হাসল। বলল, “তাহলে তুমি বুঝবে। আমাদের জন্য হাফেজ যেমন, তোমাদের জন্য হয়তো রবীন্দ্রনাথ তেমন।”

তার কথাটা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। সত্যিই কিছু কিছু কবি শুধু সাহিত্যিক না, তারা একটা জাতির আত্মা হয়ে ওঠে।

বিকেলে গেলাম বিখ্যাত এরাম গার্ডেনে, যাকে অনেকেই ফেরদৌসের বাগান বলে। পার্সিয়ান গার্ডেনের ধারণাটা এমন—মরুভূমির মাঝে মানুষ একটা স্বর্গ বানানোর চেষ্টা করে। চারদিকে পানি, মাঝখানে গাছ, ফুল, আর একটা সুন্দর প্রাসাদ। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল যেন সময় থেমে গেছে। বাতাসে কমলার ফুলের গন্ধ, আর পানির ছোট ফোয়ারা থেকে একটা নরম শব্দ আসছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে ছিলাম। পাশে বসা একজন বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শিরাজে মানুষ কবিতা আর বাগান ছাড়া বাঁচতে পারে না।”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে হাফেজের একটা লাইন আবৃত্তি করলেন—জীবন খুব ছোট, তাই প্রেম আর আনন্দকে কখনও দূরে সরিয়ে দিও না।

আরেকদিন বিকেলে কয়েকজন স্থানীয় বন্ধু আমাকে শহরের কাছে একটা পাহাড়ের দিকে নিয়ে গেল। শিরাজের কাছে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে মানুষ সন্ধ্যায় পিকনিক করতে যায়। আমরা একটা ছোট পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। সেখানে কয়েকটা পরিবার কার্পেট পেতে বসে আছে। কেউ চা বানাচ্ছে, কেউ ফল কেটে দিচ্ছে, কেউ বাচ্চাদের নিয়ে খেলছে। বাতাস ঠান্ডা, আর নিচে পুরো শিরাজ শহরের আলো জ্বলছে। একজন লোক আমাকে বলল, “ইরানে পিকনিক আমাদের সংস্কৃতির অংশ। আমরা বাড়ির চেয়ে বাইরে বেশি সময় কাটাতে ভালোবাসি।”

একজন মহিলা আমাকে এক কাপ চা দিলেন। আমি টাকা দিতে চাইলাম, কিন্তু তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “না না, এটা অতিথির জন্য।” এটা ছিল সেই বিখ্যাত তারোফ সংস্কৃতি—যেখানে আতিথেয়তা এক ধরনের সামাজিক কবিতা।

আমি সেই পাহাড়ে বসে পুরো শহরটা দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল এই শহরটা যেন ধীরে ধীরে আমার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।

আমি তখনও জানতাম না সেই রাতটা আমার জীবনের অন্যতম অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে এসেছি। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। ফোনের ওপাশে সেই মেয়েটার কণ্ঠ।

সে বলল, “আমি খুব ব্যস্ত, কিন্তু আজ রাতে একটু সময় বের করতে পেরেছি। তুমি কি ফ্রি?”

আমি বললাম, “অবশ্যই।”

সে একটু হেসে বলল, “আজ তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। কিন্তু এটা ট্যুরিস্টদের জন্য না।”

রাত একটু নামার পর আমি শহরের এক কোণে তার সাথে দেখা করলাম। সে একা ছিল না, তার সাথে আরও দুই বন্ধু ছিল। তারা আমাকে গাড়িতে উঠতে বলল। গাড়ি ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে বাইরে যেতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম আমরা কোথায় যাচ্ছি। তারা শুধু হাসল।

কিছুক্ষণ পর আমরা একটা আপেলের বাগানের কাছে পৌঁছালাম। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ একটা ফলের বাগান। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই আমি বুঝলাম এখানে অন্য কিছু হচ্ছে।

গাছের নিচে কয়েকজন ছেলে গিটার বাজাচ্ছে। একটা পুরনো স্পিকার থেকে পার্সিয়ান গান বাজছে। কয়েকজন মেয়ে মাথা খোলা রেখে নাচছে। আর একপাশে কয়েকজন লোক গোপনে অ্যালকোহল বানাচ্ছে। ইরানে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ, তাই এই পুরো পার্টিটা ছিল এক ধরনের গোপন বিদ্রোহ।

আমার সেই বন্ধুটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই হলো আমাদের ছোট স্বাধীনতা।”

আমরা আপেলের গাছের নিচে বসে ছিলাম। কেউ আমাকে ঘরে বানানো ওয়াইন দিল। একজন বলল, “শিরাজ এক সময় পৃথিবীর সেরা ওয়াইনের শহর ছিল। এখন আমরা সেটা গোপনে বানাই।”

রাত বাড়ার সাথে সাথে শুধু গান আর হাসি নয়, আমাদের কথাবার্তাও গভীর হয়ে উঠতে লাগল। আমরা শুধু নাচ বা পার্টি করছিলাম না, আমরা কথা বলছিলাম পৃথিবী নিয়ে, মানুষ নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে। কেউ উপনিষদের কথা তুলল, কেউ কোরানের কথা বলল, কেউ আয়াতোল্লাহদের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলল। আবার কেউ বলছিল ইহুদিদের ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ধর্ম আর মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে।

একজন ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “ভারতে এত ধর্ম একসাথে কীভাবে থাকে?”

আমি বললাম, “সহজ না, কিন্তু সহাবস্থান শেখাটাই আমাদের ইতিহাস।”

আরেকজন বলল, “ধর্ম মানুষকে একসাথে আনতে পারে, আবার আলাদাও করতে পারে।”

সেই আপেল গাছের নিচে আমরা দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাস—সবকিছু নিয়ে কথা বলছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন ছোট একটা বিশ্ববিদ্যালয় বসে গেছে মরুভূমির এই বাগানের মধ্যে।

কেউ হাফেজের কবিতা আবৃত্তি করছিল, কেউ বলছিল সুফি দর্শনের কথা।

আমি একজন ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, “যদি পুলিশ আসে?”

সে হাসল। বলল, “তাহলে আমরা সবাই দৌড়াবো।”

তারপর একটু থেমে বলল, “কিন্তু তাও আমরা এসব করি। কারণ মানুষ আনন্দ আর চিন্তার স্বাধীনতা ছাড়া বাঁচতে পারে না।”

সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম শিরাজ কেন আলাদা। এই শহরের আত্মা শুধু মসজিদ বা ইতিহাসে না, মানুষের ভেতরে।

আমার সেই বন্ধুটি একটু চুপচাপ হয়ে গেল। সে বলল, “আমি কয়েক সপ্তাহ পর বিয়ে করে ফেলব। হয়তো তখন আমার জীবন বদলে যাবে। তাই আজ আমি শুধু বন্ধুদের সাথে একটু মুক্ত হতে চেয়েছিলাম।”

তার চোখে একটা অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি ছিল—আনন্দ, স্বাধীনতা, আর ভবিষ্যতের অজানা পথ।

রাত যখন শেষের দিকে, আমরা সবাই একটু চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। কেউ গিটার বাজাচ্ছিল, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন আমাদের একজন ধীরে ধীরে বলল, “আজকের রাতটা আমরা কেউ ভুলব না।”

আর সত্যিই সবাই একমত হলাম—এই রাতটা ছিল আমাদের জীবনের অন্যতম সুন্দর রাতগুলোর একটি। আমরা সবাই বলেছিলাম, যতদিন বেঁচে থাকব, এই রাতটা আমাদের মনে থাকবে।

রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। আমরা শহরে ফিরে আসছিলাম। গাড়ির জানালা দিয়ে শিরাজের আলো দেখছিলাম। সেই মেয়েটা হঠাৎ বলল, “তুমি যখন নিজের দেশে ফিরে যাবে তখন হয়তো এই রাতটাকে মনে করবে।”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। কারণ আমি আজ শিরাজের আসল আত্মা দেখলাম।”

পরের দিন সকালে যখন আমি আবার শহরের রাস্তায় হাঁটছিলাম তখন মনে হচ্ছিল শিরাজ এখন আর শুধু একটা শহর না। এটা একটা অনুভূতি। হাফেজের কবিতা, ফেরদৌসের বাগানের শান্তি, পিঙ্ক মসজিদের রঙিন আলো, পাহাড়ের পিকনিকের হাসি, আপেলের বাগানের সেই গোপন পার্টি, আর মানুষের উষ্ণ হৃদয়—সব মিলিয়ে এই শহর আমার ভেতরে একটা গভীর ছাপ রেখে গেছে।

পৃথিবীতে অনেক শহর আছে যেগুলো সুন্দর। কিন্তু খুব কম শহর আছে যেগুলো মানুষের আত্মার সাথে কথা বলে। শিরাজ সেই শহরগুলোর একটা।

আর আমি জানি, জীবনের অনেক বছর পরেও যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে—ইরানের কোন শহর তোমার হৃদয়ে সবচেয়ে গভীরভাবে রয়ে গেছে—আমি নিঃসন্দেহে বলব,Shiraz,

Iran is very Close to my Heart & always will be, May, 23

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *