আমরা যখন “ইয়াজিদি” শব্দটা শুনি, তখন প্রায়শই সেটাকে এক ভয়ঙ্কর ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দেখি—একটি গণহত্যা, যা গোটা বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু শুধুমাত্র সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই মানুষদের দেখলে তাদের প্রকৃত পরিচয়, তাদের গভীরতা, তাদের সংস্কৃতি, এবং সবচেয়ে বড় কথা তাদের অসাধারণ সহনশীলতাকে আমরা বুঝতেই পারব না। আমি এই সত্যটা বই পড়ে নয়, কোনও রিপোর্ট দেখে নয়, বুঝেছিলাম এক সাধারণ বিকেলে, যখন আমি মোসুল শহরের বাইরে একটি হাইওয়ের ধারের দোকান থেকে একটি শাওয়ারমা কিনে আমার যাত্রা শুরু করেছিলাম। সেই মুহূর্তে আমি জানতাম না, এই সাধারণ যাত্রাই আমাকে নিয়ে যাবে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার দিকে—লালিশ, একটি ছোট্ট গ্রাম, কুর্দিস্তানের পাহাড়ের মাঝে লুকিয়ে থাকা, কিন্তু ইয়াজিদি ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র কেন্দ্র। মোসুল, যে শহর একসময় আইএসআইএস-এর রাজধানী ছিল, সেই অন্ধকার অতীতকে পেছনে ফেলে আমি এগোচ্ছিলাম এমন এক জায়গার দিকে, যেখানে শত শত বছর ধরে নির্যাতনের পরেও একটি সংস্কৃতি টিকে আছে, বেঁচে আছে। পাহাড়ের রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে চারপাশের দৃশ্য যেন বদলে যাচ্ছিল, যেন প্রকৃতিই এই জায়গাটিকে রক্ষা করছে বাইরের পৃথিবীর বিশৃঙ্খলা থেকে, আর যখন আমি লালিশে পৌঁছালাম, তখন মনে হল যেন আমি কোনও গ্রামে নয়, সময়ের এক অন্য স্তরে প্রবেশ করেছি, যেখানে ইতিহাস শুধু অতীত নয়, প্রতিদিনের জীবনের অংশ। সরু পথ, পাথরের নির্মাণ, আর এক অদ্ভুত নীরবতা—সবকিছুতেই ছিল এক গভীর পবিত্রতার অনুভূতি, আর প্রথম যে জিনিসটা আমার নজরে পড়ল, তা হল সবাই খালি পায়ে হাঁটছে, কারণ এই ভূমি তাদের কাছে পবিত্র। আমিও জুতো খুলে ফেললাম, আর সেই মুহূর্তে নিজেকে আর বাইরের একজন পর্যটক মনে হল না, বরং এই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠলাম। তারপর আমি দেখলাম সেই মন্দির—চূড়াগুলো আকাশের দিকে উঠে গেছে, দেখতে একেবারেই আলাদা, কিন্তু কোথাও যেন পরিচিত, যেন ভারতের প্রাচীন মন্দিরগুলোর সঙ্গে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। ভিতরে ঢুকে আমি দেখলাম জ্বলন্ত প্রদীপ, পাথরের দেয়ালে তাদের আলো নাচছে, কোনও জাঁকজমক নয়, কোনও বাহুল্য নয়, শুধু এক শান্ত, গভীর ভক্তি। সেখানেই আমার দেখা হয় এক পুরোহিতের সঙ্গে, যিনি অত্যন্ত সহজভাবে আমাকে তাদের ধর্ম, তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে বলতে শুরু করেন। আমি জানতে পারলাম তাদের ইতিহাস—একটি ইতিহাস যা হাজার বছরের পুরোনো, যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার প্রভাব, জরথুস্ত্রীয় চিন্তাধারা, এবং আরও পুরোনো ইন্দো-ইরানীয় ঐতিহ্যের ছাপ। ইয়াজিদি ধর্মকে অনেক গবেষক পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জীবিত ধর্ম বলে মনে করেন, যেখানে বহু প্রাচীন আধ্যাত্মিক ধারণা এখনও টিকে আছে। তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রে আছেন মেলেক তাউস, পিকক এঞ্জেল, যাকে অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, কিন্তু তাদের কাছে তিনি ঈশ্বরের এক বিশেষ প্রকাশ, এক জটিল প্রতীক, যা পতন, ক্ষমা এবং পুনর্জন্মের ধারণাকে বহন করে। এই সব কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, এই ধারণাগুলোর সঙ্গে আমাদের ভারতীয় ধর্মীয় চিন্তার কত মিল—চক্রাকার সময়ের ধারণা, বিভিন্ন রূপে ঈশ্বরের প্রকাশ, প্রতীকের মাধ্যমে গভীর অর্থ প্রকাশ করা—সবকিছুতেই এক অদ্ভুত সাদৃশ্য। পরে আমি তাদের আমার ফোনে ভারতের বিভিন্ন মন্দিরের ছবি দেখালাম—প্রদীপ জ্বালানো, খালি পায়ে মন্দিরে প্রবেশ, ফুল দিয়ে পূজা, আর সেই ছবি দেখে তারা সত্যিই অবাক হয়ে গেল। তারা আগে কখনও এই মিলগুলো দেখেনি, তাদের চোখে ছিল কৌতূহল আর বিস্ময়, তারা আমাকে প্রশ্ন করতে লাগল—এই রীতির মানে কী, এই দেবতারা কারা, কেন এইভাবে পূজা করা হয়। সেই মুহূর্তটা ছিল এক অসাধারণ সংযোগের, যেখানে দুই ভিন্ন সংস্কৃতি হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে গেল। আমি আরও জানতে পারলাম, ইয়াজিদিরা ইতিহাস জুড়ে বহুবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে—তাদের ভাষায় যাকে বলা হয় বাহাত্তরটি “ফিরমান”, অর্থাৎ গণহত্যার অভিযান। বিভিন্ন শাসক, বিভিন্ন সময়ে তাদের ধর্মকে ভুল বুঝে বা সহ্য করতে না পেরে তাদের ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তবুও তারা টিকে আছে, তাদের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রেখেছে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে তাদের ঐতিহ্যকে পৌঁছে দিয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও, আইএসআইএস-এর ভয়াবহ অত্যাচারের পরেও তারা আবার ফিরে এসেছে, আবার তাদের পবিত্র স্থানগুলোতে দাঁড়িয়েছে, আবার তাদের আচার-অনুষ্ঠান শুরু করেছে—এ যেন নিঃশব্দ এক প্রতিবাদ, এক ঘোষণা যে তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা যাবে না। লালিশে আমি এক পরিবারের সঙ্গে সময় কাটালাম, তাদের সঙ্গে খাবার খেলাম, হাসলাম, গল্প করলাম, আর সেখানে আবার আমি সেই একই মানবিক মিলগুলো খুঁজে পেলাম—খাবার ভাগ করে নেওয়া, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোট ছোট দৈনন্দিন আচারে লুকিয়ে থাকা সংস্কৃতি। সন্ধ্যার দিকে আমি মন্দিরের এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলাম, আর সেই মুহূর্তে আমি শুধু একজন দর্শক ছিলাম না, আমি যেন সেই ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র অংশ হয়ে উঠেছিলাম, যেখানে প্রতিটি প্রার্থনা, প্রতিটি আলো, প্রতিটি শব্দ বহন করে শত শত বছরের স্মৃতি, বেদনা, আর টিকে থাকার এক অদম্য ইচ্ছা। লালিশ ছেড়ে যখন আমি ফিরে আসছিলাম, পাহাড়গুলো যেন আবার সেই গ্রামটিকে তাদের নীরব সুরক্ষায় ঢেকে দিচ্ছিল, আর আমার মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি জায়গা দেখে ফিরছি না, আমি নিয়ে যাচ্ছি একটি গল্প—একটি মানুষের গল্প, যারা শুধু বেঁচে নেই, তারা তাদের পরিচয়, তাদের বিশ্বাস, তাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর সেই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস যতই নির্মম হোক, মানুষের আত্মা যদি দৃঢ় হয়, তবে তাকে কখনও মুছে ফেলা যায় না।November, 24

