Uruk the lost city ,I found it atlast

আমি একবার কোথাও পড়েছিলাম—

“হৃদয়ের গভীর থেকে যদি তুমি সত্যিই কিছু চাও, তবে গোটা বিশ্ব সেই ইচ্ছা পূরণে ষড়যন্ত্র করে।”

তখন কথাটাকে খুবই কবিতার মতো মনে হয়েছিল। সুন্দর, কিন্তু বাস্তব জীবনের সঙ্গে খুব একটা মিল নেই—এমনই ভেবেছিলাম। উরুক আমাকে ভুল প্রমাণ করেছিল।

সেদিন আমার হারানো ও কিংবদন্তি নগরী উরুক খোঁজার চেষ্টা হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছিল। আমাকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল—যথাযথ অনুমতি বা নথি ছাড়া কেউই উরুকের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো আলোচনার সুযোগ নেই—সরাসরি না।

উরুক তখন আমার থেকে মাত্র কুড়ি কিলোমিটার দূরে। এত কাছে, অথচ এত দূরে।

ভেঙে পড়া মন নিয়ে আমি নাসিরিয়াহর হোটেলের বিছানায় শুয়ে ছিলাম। সিলিং ফ্যানটা একটানা ঘুরছিল, আর আমার মাথার ভেতর ঘুরছিল গিলগামেশ—কোনো পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে নয়, বরং একজন বাস্তব মানুষ হিসেবে। যে এই মাটিতে হেঁটেছিল, এই শহর শাসন করেছিল, আর আমাদের মতোই মৃত্যুকে ভয় পেয়েছিল। পৃথিবীর প্রথম শহরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি থেমে গিয়েছিলাম—এই ব্যর্থতা আমাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছিল।

সেদিন একটু আগে আমি আন্তর্জাতিক ট্রাভেলারদের একটি গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম—উরুক যাওয়ার চেষ্টা করছি, কেউ যদি ইরাকে থাকে ও একই দিনে যেতে চায়। কয়েকজন উত্তর দিয়েছিল, কিন্তু কারও তারিখ আমার সঙ্গে মেলেনি। আমি তখন প্রায় মেনে নিয়েছিলাম—এই যাত্রা এখানেই শেষ।

ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এলো।

“তুমি কি নাসিরিয়াহতে আছো?”

মেসেজটা পাঠিয়েছিল একজন স্থানীয় মানুষ। সে আমার পোস্ট দেখেছিল। সে নাসিরিয়াহরই বাসিন্দা। সে নিজেও একজন ভ্রমণপ্রেমী, আর অন্য ভ্রমণকারীদের সঙ্গে দেখা করতে ভালোবাসে। সময়টা, ঘটনাটা—সবকিছু অদ্ভুতভাবে ঠিকঠাক লাগছিল।

আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলাম—হ্যাঁ, আমি নাসিরিয়াহতেই আছি। অবশ্যই আমি তার সঙ্গে দেখা করব।

সে জানাল, তখনও অফিসে আছে। কাজ শেষ হলে দেখা করতে পারবে। সে ইউফ্রেটিস নদীর ধারে একটা ছোট পার্কের লোকেশন পাঠাল এবং জিজ্ঞেস করল আমি সেখানে যেতে পারব কিনা। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। বললাম, লোকেশন নিয়ে চিন্তা নেই—অজানা শহরের রাস্তায় হাঁটতে আমার ভালো লাগে।

আমরা একটা সময় ঠিক করলাম।

আমি যেন হঠাৎই আবার জীবিত হয়ে উঠলাম। বিছানা থেকে উঠে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমার হোটেল ছিল বাজার এলাকায়—ভিড়, শব্দ, গাড়ি, মানুষের স্রোত। ফুটপাথে ধীরে ধীরে হাঁটছিলাম, লোকজন আর ঠেলাগাড়ি এড়িয়ে। মাঝে মাঝে মানুষকে জিজ্ঞেস করছিলাম—“আল ফুরাত?” মানে ইউফ্রেটিস। যদিও ম্যাপ ছিল, তবু মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতেই ভালো লাগছিল।

ভাঙা আরবি, অল্প ইংরেজি, ইশারা—এসব আর নিজের অনুভূতির ওপর ভর করেই আমি শেষমেশ নদীর কাছে পৌঁছালাম। ইউফ্রেটিস শান্তভাবে বয়ে চলেছে—হাজার হাজার বছরের ইতিহাস নিজের বুকে নিয়ে। নদীর ধারে সেই ছোট পার্ক।

আর সেখানেই—হুসেইন।

সে আগেই এসে অপেক্ষা করছিল।

আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য সেদিন সে অফিস থেকে আগেভাগেই ছুটি নিয়েছিল।

আমরা রাস্তার ধারে একটা ছোট চায়ের দোকানে বসলাম—একেবারে ভারতের মতো। একই গ্লাস, একই ভাপ ওঠা চা। চা অর্ডার করে কথা শুরু করলাম।

সে বলল, বিশ্বাসই করতে পারছে না যে আমি এত দূর এসেছি। এই এলাকায় সে আগে কখনও কোনো ভারতীয় ভ্রমণকারী দেখেনি। তারপর সে জিজ্ঞেস করল—আমি কি কোনো সাহায্য চাই।

আমি তখন পুরো দিনের গল্পটা বললাম। উরুক যাওয়ার চেষ্টা, অনুমতি না পাওয়া, এত কাছে গিয়েও ফিরে আসা—সব।

সে খুব মন দিয়ে শুনল। চুপচাপ।

কিছুক্ষণ পর বলল,

“এটা ঠিক নয়। উরুকে যেতে আলাদা অনুমতি লাগে না। আমি জানি কিছু জার্মান সম্প্রতি সেখানে গিয়েছিল।”

আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে জিজ্ঞেস করল—পরের দিনের প্ল্যান কী।

বলল,

“আগামীকাল সকালটা কি ম্যানেজ করতে পারবে?”

আমি বললাম—হ্যাঁ। প্রয়োজনে পুরো প্ল্যান বদলে দেব।

সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে কাউকে কল করল। আরবিতে দ্রুত কথা বলছিল। হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল,

“সকাল ৭টায় রেডি থাকতে পারবে?”

আমি বললাম—হ্যাঁ।

ফোন রেখে সে হাসল।

“হয়ে গেছে। আমার বন্ধু তোমাকে সকাল ৭টায় হোটেল থেকে তুলে নেবে। উরুকে নিয়ে যাবে, আবার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নামিয়ে দেবে। দুই-তিন ঘণ্টার বেশি সে অপেক্ষা করতে পারবে না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম—কত টাকা দিতে হবে?

সে বলল,

“যা খুশি। শুধু ফুয়েলের টাকা দিলেই হবে।”

আমার কিছু বলার ছিল না।

আমি তার হাত ধরে ধন্যবাদ দিলাম। সে বলল,

“এটাকে ভারতীয় বন্ধুর জন্য একজন ইরাকির উপহার হিসেবে নাও।”

সেই রাতটা স্বপ্নের মতো কেটে গেল। আমরা অনেকক্ষণ কথা বললাম—ভ্রমণ, ইতিহাস, জীবন, বিশ্বাস নিয়ে। সে আমাকে গাড়িতে করে নাসিরিয়াহ ঘুরিয়ে দেখাল। আমরা একসঙ্গে ডিনার করলাম—যেটার দাম আমি দিলাম, আমার ছোট্ট উপহার হিসেবে। পরে সে আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিল।

সেই রাতে ঘুম আসেনি।

পরদিন ঠিক সকাল ৭টায় যাত্রা শুরু হলো।

আমরা এমন একটা রাস্তা নিলাম যেটা সাধারণত কেউ নেয় না। ধীরে ধীরে শহর পেছনে পড়ে গেল। পাকা রাস্তা শেষ হলো। শুধু মরুভূমি। চারপাশে নীরবতা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আমরা একেবারে মাঝখানে—একটা ঘেরা, সুরক্ষিত এলাকায় পৌঁছালাম।

এই ছিল উরুক।

চেকপোস্টে পুলিশ আমাদের থামাল। পাসপোর্ট দেখল, ব্যাগ তল্লাশি করল। তারপর গেট খুলে দিল।

উরুক এখনো পুরোপুরি খনন শেষ হয়নি। পৃথিবী যা জানে, তা আসলে অল্প অংশ। এই জায়গাটা এত কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয় কারণ উরুক শুধু একটা ধ্বংসাবশেষ নয়—এখানেই শহর সভ্যতা, রাজত্ব, প্রশাসন, আর লেখার জন্ম।

ভেতরে ঢুকে কোনো রাস্তা নেই। শুধু বালি। ছোট ছোট ঢিবি—চোখে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু আমি জানতাম, প্রতিটা ঢিবির নিচে শত শত বছরের ইতিহাস চাপা পড়ে আছে—মন্দির, ঘর, প্রশাসনিক ভবন, রাস্তা।

একসময় উরুকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ বাস করত—সে যুগে অকল্পনীয় সংখ্যা। এখানেই প্রথম লেখা তৈরি হয়—প্রোটো-কিউনিফর্ম। কবিতা নয়, দর্শন নয়—শস্য, পশু, লেনদেনের হিসাব। সভ্যতার জন্ম হয়েছিল প্রয়োজন থেকে।

আমি যত এগোচ্ছিলাম, আমার হৃদস্পন্দন তত জোরে হচ্ছিল।

মরুভূমি যেন ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছিল।

আমার কানে ভেসে আসছিল মানুষের কথা, বাজারের শব্দ, গরুর গাড়ির চাকা। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আনু দেবতার সাদা মন্দির, ইনান্নার উপাসনালয়—ভালোবাসা, উর্বরতা আর যুদ্ধের দেবী।

এই ছিল গিলগামেশের শহর।

কোনো গল্প নয়। কোনো কল্পনা নয়।

এখানেই এক রাজা তার বন্ধুর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল। এখানেই সে অমরত্ব খুঁজতে বেরিয়েছিল। এখানেই মানুষ প্রথম বুঝেছিল—মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।

আমি তখন কোনো পর্যটক ছিলাম না।

আমি ছিলাম একজন সাক্ষী।

সময়ের কথা মনে করিয়ে দিল ড্রাইভার। আমাকে ফিরতে হলো। আমি বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলাম—মনে হচ্ছিল চোখ সরালেই উরুক হারিয়ে যাবে।

গেট বন্ধ হলো। মরুভূমি আবার শহরটাকে গ্রাস করল।

কিন্তু উরুক ততক্ষণে আমার ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে।

আর সেই ভেতরের আলো নিয়েই আমার পথ ধীরে ধীরে ঘুরে গেল আরেক প্রাচীন খোঁজের দিকে—বাইবেলের গার্ডেন অব ইডেন, যেখানে ইউফ্রেটিস আবার প্রবাহিত, যেখানে আদম প্রথম দাঁড়িয়েছিল জ্ঞান আর নিষ্পাপতার মাঝখানে।

পথ তখনও চলছিল।

November, 24

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *