A DAY WITH MURSI PEOPLE

ওমো ভ্যালি-র পথে যাত্রা কোনো সাধারণ যাত্রা নয়। এ পথ ধুলো, নীরবতা আর অদৃশ্য বিপদের পথ। ভোরবেলায় রওনা হয়েছিলাম, তখনো কুয়াশা আঁকড়ে ধরে রেখেছে আকাশ। আমাদের গাড়ি কাঁপতে কাঁপতে এগোচ্ছে কাঁচা রাস্তা ধরে—প্রতিটি ধাক্কা যেন প্রকৃতির একেকটা পরীক্ষা। চারপাশে নেই কোনো শহর, দোকান, কিংবা মানুষ; কেবল নির্জন আফ্রিকার অসীম বিস্তার।

সূর্য ওপরে উঠতেই তাপ অসহনীয় হয়ে উঠল। এই উপত্যকার নামই ভয়ের প্রতীক—বিষাক্ত বিচ্ছু, সাপ আর নির্দয় প্রান্তর মনে করিয়ে দিচ্ছিল, আমি নিরাপদ জগত থেকে বহু দূরে। মাঝেমধ্যে আমাদের চালক দেখাতেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর খাত, যেখানে একসময় আকস্মিক বন্যা পুরো ট্রাক গিলে নিয়েছে। মনে হচ্ছিল, এখানে যদি কিছু ঘটে যায়, সাহায্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

যত গভীরে যাচ্ছি, ভয় তত বাড়ছে। স্থানীয়রা বলেছিল, মুরসি যোদ্ধারা সর্বদা রাইফেল বহন করে, আর গবাদি পশু লুঠ বা গোত্রসংঘর্ষ তাদের জীবনের অংশ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কিছু লোকের চোখে চোখ পড়ল—নীরব, কিন্তু অস্ত্রের ঝলক আমার বুক কেঁপে দিল। তারা কৃষক, নাকি দস্যু—বোঝার উপায় নেই।

ঘন্টার পর ঘন্টা ভয়াবহ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে দেখা মিলল মুরসি গ্রাম। কাঁটাঝোপ দিয়ে ঘেরা কুটিরগুলো দূর থেকে লাল ধুলোর মধ্যে ছায়ার মতো ভেসে উঠল। খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে বাচ্চারা, আর মহিলারা দাঁড়িয়ে আছেন বিশাল ঠোঁটের প্লেট নিয়ে—অচেনা এক জগতের দ্বাররক্ষকের মতো।

গ্রামে পা দিয়েই টের পেলাম দমবন্ধ পরিবেশ। পুরুষরা সশস্ত্র, গায়ে রঙ করা সাদা-কালো নকশা। তাদের দৃষ্টির ভেতর ছিল কৌতূহল আর সতর্কতা—আমি যে একজন অচেনা অতিথি, তা তারা ভুলতে দিচ্ছিল না। ভয় আর মুগ্ধতা একসাথে কাজ করছিল।

মুরসি মহিলাদের ঠোঁটের মাটির প্লেট প্রথম দেখাতেই মনে হলো ভয়ঙ্কর, অথচ তাদের কাছে এটা সৌন্দর্য, শক্তি আর নারীত্বের প্রতীক। কিশোরী বয়সে নিচের ঠোঁট কেটে ছোট প্লেট বসানো হয়, বছর বাড়ার সাথে সাথে প্লেট বড় হতে থাকে। আগে এর আকারে নির্ধারিত হতো পণ বা কতো গরু পরিবার পাবে। এ যেন যন্ত্রণা নয়, বরং গর্বের চিহ্ন।

পুরুষরা দেখাল শরীরে কাটা দাগ—দাগকাটা নকশা, যা প্রতিটি লড়াই বা সাহসিকতার স্মৃতি বহন করে। এগুলো ক্ষত নয়, বরং সম্মানের পদক।

এরপর শুরু হলো ডোঙ্গা—তাদের ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। যুবকেরা কোমর পর্যন্ত উলঙ্গ, শরীরে আঁকা রঙ, হাতে লম্বা কাঠের দণ্ড। মাটির মাঠে তারা একে অপরের সাথে লড়াই শুরু করল। কাঠের আঘাতে ধুলো উড়ছে, শব্দে কেঁপে উঠছে চারদিক। এটা নিছক খেলা নয়—এটা সাহসের পরীক্ষা, সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার উপায়, কখনো বিয়ের অধিকার অর্জনের লড়াই।

মুরসিদের জীবন গরুকে ঘিরে। গরুই সম্পদ, মর্যাদা আর বেঁচে থাকার মূল ভরসা। দুধ তাদের প্রধান খাদ্য, গরুই পণ হিসেবে দেওয়া হয়, আবার গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণও হয়। তাদের বিশ্বাসও পশু আর প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে। তারা প্রকৃতির আত্মায় আস্থা রাখে—নদীর আত্মা, বৃষ্টির আত্মা, আর উর্বরতার আত্মা। শামান বা পুরোহিতরা নিয়মিত আচার পালন করেন, কখনো গবাদি পশু বলিদান দিয়ে এই আত্মাদের শান্ত করা হয়।

সূর্য ডুবে গেলে শিশুরা ধুলোয় খেলা করছিল, মহিলারা আগুনের চারপাশে বসেছিল, তাদের ঠোঁটের প্লেটে আগুনের আলো ঝলমল করছে। রাইফেল, দাগ আর ভয়ংকর চেহারার মাঝেও ছিল গান, হাসি আর এক অচেনা কোমলতা।

রাত নেমে এলে যখন গ্রাম ছাড়লাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি শুধু এক অদ্ভুত সংস্কৃতির সাক্ষাৎ পেলাম না, বরং এমন এক যাত্রার অভিজ্ঞতা পেলাম যা একইসাথে ভীতিকর ও মুগ্ধকর। এ পথ যেমন সম্মান দাবি করে, তেমনি ভয়ও জাগায়—ঠিক মুরসি মানুষদের মতো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *