মধ্যযুগের সাতশো বছর আগে ভূমধ্যসাগরের তীরের ছোট্ট শহর ট্যাঞ্জিয়ারে এক তরুণ দাঁড়িয়ে পূর্ব দিগন্তের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখছিল—ভারত যাওয়ার স্বপ্ন। আফ্রিকার একেবারে পশ্চিম প্রান্ত থেকে ভারত তখন যেন কোনো দূর-অদৃশ্য কল্পলোক; পথের দৈর্ঘ্য আর বিপদ এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে ভাবাই কঠিন। কিন্তু সেই তরুণ, ইবন বতুতা, বিশ্বাস করতেন যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপ দিয়ে, আর সেই বিশ্বাসই তাকে ১৩২৫ সালে বাড়ি ছেড়ে প্রথমে শুধু হজের উদ্দেশ্যে রওনা করায়। ভাগ্যের ইচ্ছা ছিল আরও বড়। সেই ছোট্ট যাত্রাই তাকে টেনে নিয়ে গেল মিশরের বালিয়াড়ি, আরবের পবিত্র শহর, পারস্যের উদ্যান, আফ্রিকার উপকূল, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সুমাত্রা থেকে চীনের বিশাল সাম্রাজ্য পর্যন্ত—প্রায় তিরিশ বছরের এক কিংবদন্তি অভিযানে, যা আজও ইতিহাসের বিস্ময়।
১৩৩৩ সালে তিনি যখন ভারতে পৌঁছলেন, তখনকার দিল্লি ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈততার শহর—সমৃদ্ধি আর বিশৃঙ্খলার মিশ্র ছন্দ, সুগন্ধে ভরা ব্যস্ত রাস্তা, অলৌকিক ঘটনার গল্প, আর মুহাম্মদ-বিন-তুঘলকের দরবার, যেখানে ইবন বতুতা কাজি হিসেবে কাজ করেন। এরপর তার পথ তাকে নিয়ে যায় দিল্লি, দৌলতাবাদ, মালাবার, গোয়া ও ভারত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে—জাহাজডুবি, সাধু-ফকির, রাজদরবার আর অসম্ভব সব আড্ডায় ভরা এক জীবন, যা পরে তার বিখ্যাত ভ্রমণকথায় অমর হয়ে আছে।
শতাব্দী পরে আমি যখন ট্যাঞ্জিয়ারের সরু গলি পেরিয়ে তার সমাধির সামনে দাঁড়ালাম, তখন অদ্ভুত এক সংযোগ অনুভব করলাম। আমিও তো ঘুরেছি আফ্রিকার মরুভূমি, ইরাক-ইরানের শহর, আফগানিস্তানের গুপ্ত পথ, মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ স্টেপ, আর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত—অজান্তেই যেন তার পথের কিছু অংশ আমিও হেঁটেছি। মনে হলো যুগের পর যুগ পেরিয়েও ভ্রমণের সেই আগুন আমাদের দু’জনকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে; তার কৌতূহল, তার দিগন্তদেখা মন যেন কোথাও আমার নিজের ভ্রমণের সাথী।
তার সমাধিতে দাঁড়িয়ে এটাই ছিল আমার শ্রদ্ধা—এক যাত্রীকে আরেক যাত্রীর নীরব অভিবাদন। কিছু যাত্রা মানুষে মানুষে নয়, শতাব্দী আর হৃদয়ের ভেতর দিয়ে সংযোগ তৈরি করে। আর সেই মুহূর্তে সত্যি মনে পড়ল মহা-চীনা ঋষি লাও ত্সুর চিরন্তন বাণী:
“হাজার মাইলের পথও শুরু হয় মাত্র এক পা ফেলে।”

