সমরকন্দ—নামটা উচ্চারণ করলেই যেন নীল আভায় মোড়া এক প্রাচীন স্বপ্ন খুলে যায়, আর আমি যখন বহুবার এই শহরে ফিরে এসেছি, প্রতিবারই মনে হয়েছে ইতিহাস আমাকে নতুন করে আলিঙ্গন করছে। রেগিস্তানের নীল গম্বুজগুলো রোদে ঝিকিমিকি করে, আর প্রতিটি টাইল, প্রতিটি খোদাই যেন ভারত, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার মিলিত ইতিহাসের সুর বাজায়। আমি ইরানে গিয়ে পারস্য স্থাপত্যের মহিমা দেখেছি—ইসফাহানের নীল গম্বুজ, ইয়াজদের জ্যামিতিক নকশা, শিরাজের সূক্ষ্ম কারচুপি—এগুলো আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে পারস্য শিল্প একসময় সমগ্র অঞ্চলে তার ছাপ ফেলেছিল। আর সেই ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল তিমুরিদ শিল্পকলা, যেটি পরবর্তীতে সমরকন্দের স্থাপত্যকে অদ্বিতীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইতিহাস বলে তিমুরের সাম্রাজ্যের সময় পারস্যের মাস্টার কারিগর, আজারবাইজানের সূক্ষ্ম নকশার শিল্পী, তুর্কি ক্যালিগ্রাফার—all মিলে এক নতুন নান্দনিকতার জন্ম দেন, যেখানে নীল টাইল, জ্যামিতিক প্যাটার্ন, বিশাল প্রবেশদ্বার এবং আকাশ ছোঁয়া মাদ্রাসাগুলো একসাথে দাঁড়িয়ে এক মহাকাব্যিক সৌন্দর্য তৈরি করে। আর এই তিমুরিদ রীতি পরবর্তীতে ভারতে মোগল স্থাপত্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়—যার শিখরে রয়েছে আগ্রার তাজমহল, দিল্লির হুমায়ুনের সমাধি, ফতেপুর সিক্রির সূক্ষ্ম কারুকাজ। তাই যখন আমি রেগিস্তানের টাইল ছুঁই, মনে হয় আমি আগ্রার প্রথম নকশাগুলো ছুঁয়ে আছি। গুরু-ই-আমিরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে পড়ে যায় বাবরের স্বপ্ন—সমরকন্দ ফিরে পাওয়ার সেই আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত তাকে ভারত পৌঁছে দিয়েছিল, আর সেখানেই শুরু হয়েছিল আমাদের নিজের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। সিল্ক রোডের বাতাসে আজও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পদচিহ্ন ভেসে ওঠে—যারা একসময় তুলা, মশলা, পুঁথি নিয়ে এই পথে চলে আসতেন, আর ফিরতেন সমরকন্দের জ্ঞান, শিল্প আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলো নিয়ে। আমি যতবার এই শহরে এসেছি, ততবারই অনুভব করেছি যে সমরকন্দ আমার কাছে শুধু এক ভ্রমণস্থান নয়—এটি এক সেতুবন্ধন, যেখানে ভারত, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার ইতিহাস একই শ্বাসে মিশে আছে। আর যখন সন্ধ্যার আলোয় নীল গম্বুজগুলো সোনালি আভায় রঙ বদলায়, তখন মনে হয় আমি কোনও দূরদেশে নয়, বরং একটি বিস্মৃত সভ্যতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমার নিজের ইতিহাসও নিঃশব্দে জেগে ওঠে। সমরকন্দ আমাকে শেখায়—ভ্রমণ শুধু দূরত্বের পথ নয়, এটি সেইসব গভীর সংযোগের স্মৃতি, যা কখনও মুছে যায় না।
JOURNEY TO SAMARKAND

