ইস্ফাহানে পৌঁছানোর আগেই আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন শুধু একটা শহরে যাচ্ছি না, বরং একটা সময়ের মধ্যে প্রবেশ করতে চলেছি—একটা সময় যেখানে সাম্রাজ্য ছিল, শিল্প ছিল, কবিতা ছিল, আর মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ছোঁয়া ছিল, তেহরান থেকে বাস যখন ধীরে ধীরে ইস্ফাহানের দিকে এগোচ্ছিল, জানলার বাইরে ধূসর পাহাড় আর শুকনো ভূমির মাঝে মাঝে হঠাৎ সবুজের ছোঁয়া আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল পারস্যের সেই প্রাচীন শক্তিকে, আর শহরে ঢোকার সাথে সাথেই বুঝে গেলাম কেন পার্সিয়ানরা বলে “Esfahan nesf-e jahan”—ইস্ফাহান অর্ধেক পৃথিবী, এই শহরটা যেন সত্যিই পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে, আমি যখন প্রথমবার নকশে জাহান স্কোয়ারে পা রাখলাম, তখন সূর্যটা হালকা ঢলে পড়ছে, সেই বিশাল খোলা চত্বর, চারপাশে রাজকীয় স্থাপত্য—ইমাম মসজিদ, শেখ লুতফুল্লাহ মসজিদ, আলী কপু প্রাসাদ—সবকিছু যেন একসাথে মিলে একটা জীবন্ত চিত্রকর্ম হয়ে উঠেছে, মাটির উপর বসে থাকা মানুষজন, ঘোড়ার গাড়ি, হাসি, বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ—সবকিছুতেই একটা শান্ত অথচ গভীর প্রাণ আছে, আমি বসে পড়লাম এক কোণে, শুধু দেখছিলাম, অনুভব করছিলাম, মনে হচ্ছিল ইতিহাসটা আমার চারপাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, এই সেই জায়গা যেখানে শাহ আব্বাস তার সাম্রাজ্যের হৃদয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে বাণিজ্য, শিল্প, ধর্ম—সব এক জায়গায় মিলেছিল, ইমাম মসজিদের নীল টাইলসগুলো যখন সূর্যের শেষ আলোয় ঝলমল করছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন আকাশটা মাটিতে নেমে এসেছে, আর শেখ লুতফুল্লাহ মসজিদের সেই সূক্ষ্ম নকশা, ভেতরের গম্বুজের জ্যামিতিক প্যাটার্ন—ওটা শুধু স্থাপত্য না, ওটা এক ধরনের ধ্যান, এক ধরনের নীরব প্রার্থনা, আমি ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কোনো শব্দ নেই, শুধু আলো আর ছায়ার খেলা, সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমি আর আমি নেই, আমি শুধু একটা দর্শক, সময়ের সাক্ষী, এরপর আলী কপু প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন পুরো স্কোয়ারটা দেখছিলাম, তখন বুঝলাম কেন এই জায়গাটা এত গুরুত্বপূর্ণ, এখান থেকে রাজারা শুধু তাদের সাম্রাজ্য না, মানুষের জীবনকেও দেখতেন, একটা অদ্ভুত সংযোগ অনুভব করলাম—ইতিহাস আর বর্তমানের মাঝে, তারপর সন্ধ্যা নামতে শুরু করল, স্কোয়ারে আলো জ্বলল, পরিবারগুলো এসে বসলো, কেউ চা খাচ্ছে, কেউ গল্প করছে, আমি এক কোণে বসে ইস্ফাহানি বিরিয়ানি খেতে শুরু করলাম, আর এখানেই একটা বড় পার্থক্য বুঝলাম, আমাদের ভারতীয় বিরিয়ানি যেখানে সুগন্ধি চাল, মশলার স্তর আর মাংসের মিশেলে তৈরি একটা জটিল স্বাদের গল্প, ইস্ফাহানি বিরিয়ানি সেখানে একেবারে আলাদা—এটা চাল দিয়ে তৈরি না, বরং মাংস আর ফ্যাটের এক ধরনের ঘন, সমৃদ্ধ পেস্ট, তান্দুরের মতো রুটির উপর পরিবেশন করা হয়, প্রথমে একটু অচেনা লাগে, ইস্ফাহানের বিরিয়ানি সেখানে পারস্যের সরল অথচ শক্তিশালী খাদ্যসংস্কৃতির প্রতিফলন, এরপর আমি হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম সিওসে পোল আর খাজু ব্রিজের কাছে, রাতে এই ব্রিজগুলো যেন অন্য এক জগতে নিয়ে যায়, নিচে নদী, উপরে আলো, আর ব্রিজের নিচে বসে মানুষ গান গাইছে, সেই পার্সিয়ান গানগুলো—একটু বিষণ্ণ, একটু আশাবাদী—আমার মনে এক অদ্ভুত আবেগ তৈরি করছিল, আমি বসে পড়লাম তাদের পাশে, ভাষা বুঝি না, কিন্তু অনুভূতিটা বুঝতে পারছিলাম, এটা একটা শহর যেখানে মানুষ এখনো সময় নেয়, কথা বলে, গান গায়, বেঁচে থাকে, এরপর একদিন আমি ইস্ফাহানের আর্মেনিয়ান কোয়ার্টার জোলফা এলাকায় গেলাম, আর সেখানেই প্রথমবার বুঝলাম এই শহরের আরেকটা মুখ, ভ্যাঙ্ক ক্যাথেড্রালের ভেতরে ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম—খ্রিস্টান শিল্প, পার্সিয়ান স্টাইল, একসাথে মিশে গেছে, দেয়ালের চিত্রগুলোতে বাইবেলের গল্প, কিন্তু তার উপস্থাপনায় একদম পার্সিয়ান ছোঁয়া, এখানেই আমি ইস্ফাহানের ইহুদি সম্প্রদায়ের কথাও শুনলাম, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা এখানে বসবাস করেছে, তাদের সিনাগগ আছে, তাদের ইতিহাস আছে, এই শহরটা শুধু মুসলিমদের না, এটা বহু সংস্কৃতির মিলনস্থল, একটা সহাবস্থানের উদাহরণ, যা আজকের পৃথিবীতে খুব কম দেখা যায়, আমি এক বৃদ্ধ ইরানির সাথে কথা বলছিলাম, তিনি বললেন “ইস্ফাহান শুধু একটা শহর না, এটা একটা ধারণা”—আমি তখন বুঝলাম তিনি কী বলতে চাইছেন, এই শহরটা শুধু স্থাপত্য বা ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ না, এটা মানুষের মনের একটা অবস্থা, একটা দৃষ্টিভঙ্গি, এরপর আমি কার্পেট বাজারে গেলাম, আর সেখানে ঢুকে যেন আরেকটা জগতে প্রবেশ করলাম, প্রতিটা কার্পেট একটা গল্প, হাতে বোনা, মাসের পর মাস, কখনো কখনো বছরের পর বছর ধরে তৈরি, সেই নকশাগুলো—ফুল, জ্যামিতিক প্যাটার্ন, গল্প—সবকিছুতেই একটা ইতিহাস লুকিয়ে আছে, একজন কারিগর আমাকে বললেন, “আমরা শুধু কার্পেট বানাই না, আমরা সময় বুনি”, তার কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল, আমি একটা কার্পেটের উপর হাত বুলিয়ে অনুভব করছিলাম সেই সময়, সেই পরিশ্রম, সেই শিল্প, ইস্ফাহানের স্থাপত্য, তার সেতু, তার মসজিদ, তার বাজার—সবকিছুতেই একটা ধারাবাহিকতা আছে, একটা আত্মা আছে, আমি যখন শহরটা ছেড়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি কিছু রেখে যাচ্ছি না, বরং কিছু নিয়ে যাচ্ছি—একটা অনুভূতি, একটা উপলব্ধি, একটা সংযোগ, ইস্ফাহান আমাকে শুধু দেখার অভিজ্ঞতা দেয়নি, এটা আমাকে অনুভব করতে শিখিয়েছে, ধীরে চলতে শিখিয়েছে, সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে, আর সবচেয়ে বড় কথা, এটা আমাকে বুঝিয়েছে যে ইতিহাস শুধু বইয়ে থাকে না, এটা মানুষের জীবনে, তাদের কথায়, তাদের গানে, তাদের খাবারে, তাদের স্থাপত্যে বেঁচে থাকে, আর আমি সেই জীবন্ত ইতিহাসের একটা ছোট্ট অংশ হয়ে গিয়েছিলাম কিছু সময়ের জন্য, আর হয়তো সেই কারণেই আজও মনে হয়, ইস্ফাহান সত্যিই অর্ধেক পৃথিবী না, বরং পুরো একটা পৃথিবী নিজের মধ্যেই ধারণ করে আছে।
Esfahan nesf-e jahan

