Lost City of Hatra

Lost City of Hatra

হাত্রা… Hatra—মরুভূমির বুকের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভুলে যাওয়া নগরী, যেখানে সময় শুধু থেমে যায় না, ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়, আমি যখন সেই শহরের ভাঙা ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, যেন কোনো অদৃশ্য দরজা পেরিয়ে অন্য এক যুগে চলে এসেছি, বাতাসে ধুলো উড়ছিল, কিন্তু সেই ধুলোর মধ্যেই ছিল হাজার বছরের ইতিহাসের গন্ধ, আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিল সেই রহস্যময় স্থাপনা—একটা ঘন, শক্ত, কিউব আকৃতির কাঠামো, যেটাকে স্থানীয়রা অনেকেই “কাবা”-র মতো বলে, আর সত্যিই, আমি যখন ওটার সামনে দাঁড়ালাম, তখন আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল, কারণ শুধু দেখতে নয়, এর চারপাশে যে অনুভূতিটা তৈরি হয় সেটা যেন অদ্ভুতভাবে পরিচিত, আমাকে বলা হলো, এখানকার প্রাচীন মানুষরা এই কাঠামোটিকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করত, ঠিক যেমন Kaaba-কে ঘিরে তাওয়াফ করা হয়, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর মনে হচ্ছিল এই বৃত্তটা শুধু শারীরিক নয়, এটা সময়েরও একটা বৃত্ত, হাজার বছর আগে যারা এখানে হাঁটত, তাদের পদচিহ্ন যেন এখনো বালির নিচে চাপা পড়ে আছে, আর আমি সেই একই পথে দাঁড়িয়ে আছি, এই শহরটা শুধু স্থাপত্য নয়, এটা বিশ্বাসের এক সংমিশ্রণ, একটা অদ্ভুত হাইব্রিড, কারণ আমাকে বলা হলো, যখন Roman Empire আর তার প্রভাব এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আরবদের প্রাচীন পৌত্তলিক উপাসনালয়গুলো ধীরে ধীরে রোমান দেবদেবীর ছায়ায় ঢেকে যায়, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে মুছে যায় না, বরং একটা নতুন রূপ নেয়, আর সেই রূপটা আমি হাত্রার প্রতিটি দেয়ালে দেখতে পাচ্ছিলাম, এখানে দেবতাদের মূর্তিগুলোতে আরবীয় বৈশিষ্ট্য, রোমান শৈলী, আর মেসোপটেমিয়ান ঐতিহ্যের এক অদ্ভুত মিশ্রণ, যেন সভ্যতাগুলো এখানে এসে একে অপরের সাথে কথা বলেছে, লড়াই করেছে, আবার মিলেও গেছে, আর এই মিলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেই প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস, যার শিকড় গিয়ে মিশেছে Assyrian Empire-এর গভীরে, অ্যাসিরিয়ানদের নিজস্ব ধর্মতত্ত্ব আর পুরাণ ছিল এই অঞ্চলের আত্মা, তারা বিশ্বাস করত শক্তিশালী দেবতা, অর্ধদেবতা আর রক্ষাকারী সত্ত্বার অস্তিত্বে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ছিল লামাসু—Lamassu—মানুষের মুখ, ষাঁড় বা সিংহের দেহ আর ডানাওয়ালা এক সত্তা, যাকে শহরের রক্ষক মনে করা হতো, আমি জানতাম এই অঞ্চলের বহু প্রাচীন নগরে লামাসুর বিশাল মূর্তি ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু হাত্রায় দাঁড়িয়ে আমি একটা অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করলাম, কারণ এখানে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই, হয়তো ছিল, কিন্তু আজ আর নেই, হয়তো ধ্বংস হয়েছে, হয়তো চুরি হয়েছে, অথবা হয়তো সময়ই তাদের মুছে দিয়েছে, আর এই অনুপস্থিতিটা যেন আরও বেশি রহস্য তৈরি করে, যেন কিছু একটা এখানে থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেই, আর সেই অনুপস্থিতির মধ্যেই একটা ভারী নীরবতা, আমি যখন শহরের ভেতরে হাঁটছিলাম, তখন চোখে পড়ছিল দেয়ালের গায়ে গুলির দাগ, ভাঙা মূর্তি, আর অদ্ভুত কিছু লেখা—গ্রাফিতি, যা আধুনিক, কিন্তু এই প্রাচীন শহরের সাথে ভয়ংকরভাবে বেমানান, আমাকে বলা হলো, ISIS এই জায়গাটাকে তাদের ট্রেনিং সেন্টার বানিয়েছিল, আমি চারপাশে তাকালাম, আর হঠাৎ বুঝতে পারলাম এই নীরবতার মধ্যে একটা সহিংসতার প্রতিধ্বনি আছে, তারা শুধু এই শহর দখল করেনি, তারা এর আত্মাকে আঘাত করেছে, প্রাচীন পাথরের মূর্তিগুলোকে তারা টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্য ব্যবহার করেছে, কল্পনা করো, হাজার বছরের পুরনো দেবতার মুখে গুলি চালানো হচ্ছে, সেই পাথরগুলো, যেগুলো একসময় পূজিত ছিল, আজ গুলির দাগে ভরা, যেন একটা সভ্যতার মুখে আঘাত, আমি একটা ভাঙা মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তার মুখ প্রায় নেই, শুধু গুলির চিহ্ন, আর মনে হচ্ছিল সে যেন চুপচাপ সব সহ্য করছে, কোনো প্রতিশোধ নেই, কোনো শব্দ নেই, শুধু নীরবতা, আর সেই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর, আমি সেই “কাবা”-সদৃশ কাঠামোর কাছে ফিরে এলাম, সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে, লাল আলো পড়ছে তার গায়ে, আর সেই আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল গুলির চিহ্ন, ইতিহাসের ওপর আধুনিক সহিংসতার দাগ, আমি চোখ বন্ধ করলাম, আর কল্পনা করার চেষ্টা করলাম—একসময় এখানে মানুষ ঘুরছে, প্রার্থনা করছে, ধূপ জ্বলছে, আর আজ… শুধু বাতাস, ধুলো আর ক্ষত, হাত্রা যেন একটা আয়না, যেখানে তুমি একসাথে দেখতে পাও মানুষের সৃষ্টি, বিশ্বাস, আর ধ্বংসের ক্ষমতা, এই শহরটা তোমাকে প্রশ্ন করে—কী টিকে থাকে? পাথর, নাকি স্মৃতি? আমি যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি কিছু একটা রেখে যাচ্ছি, অথবা হয়তো কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছি, একটা ভার, একটা অনুভূতি, যা ব্যাখ্যা করা যায় না, হাত্রা শুধু একটা জায়গা নয়, এটা একটা অভিজ্ঞতা, একটা অদ্ভুত, রহস্যময়, আর কিছুটা ভীতিকর যাত্রা, যেখানে অতীত আর বর্তমান একে অপরের সাথে মিশে গেছে, আর সেই মিশ্রণের মধ্যে দাঁড়িয়ে তুমি বুঝতে পারো, ইতিহাস কখনো মরে না, সেটা শুধু রূপ বদলায়, আর কখনো কখনো… গুলির দাগ হয়ে ফিরে আসে, Nov-24

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *