Eyes of Buddha, Bamyan

বান্দে আমির থেকে ফিরে আসার সময়ই বুঝেছিলাম, বামিয়ান বুদ্ধ দেখাটা আমার এই আফগানিস্তান যাত্রার সবচেয়ে ভারী অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। বান্দে আমির চোখকে মুগ্ধ করে, কিন্তু বামিয়ান বুকের ভেতর কোথাও আঘাত করে। রাস্তা ধরে গাড়ি চলছিল, চারপাশে বিস্তীর্ণ উপত্যকা, আলুক্ষেত, ছোট ছোট গ্রাম, আর দূরে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো। প্রথম দেখায় মনে হয় একেবারে সাধারণ একটা গ্রামীণ অঞ্চল, কিন্তু এই শান্ততাই আসলে সবচেয়ে ভয়ংকর—কারণ এই মাটির ভেতর জমে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, যুদ্ধ, ধ্বংস, আর তবুও বেঁচে থাকার গল্প।

আমাদের সঙ্গে ছিলেন আমার এক বন্ধু, একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। তিনি এখন আফগান সরকারের সঙ্গে কাজ করেন। বাইরে থেকে শুনলে অনেকের কাছে বিষয়টা অস্বস্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু তাঁর চোখে আমি কোনো রাজনীতি দেখিনি। দেখেছি দায়িত্ববোধ, আর এই উপত্যকার প্রতি গভীর ভালোবাসা। গাড়ি চলতে চলতে তিনি বলতে শুরু করলেন, কীভাবে বামিয়ান শুধু বুদ্ধমূর্তির জন্য নয়, বরং পুরো মধ্য এশিয়ার ইতিহাস বোঝার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি খুব শান্ত, কোনো নাটকীয়তা নেই, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন ভারী।

বামিয়ান শহরে ঢুকতেই প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, সেটা পাহাড়ের গায়ে বিশাল দুটি ফাঁকা কুলুঙ্গি। প্রথমে বুঝতেই পারিনি। একটু তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ মনে হলো—এখানেই তো ছিল সেই বুদ্ধমূর্তি। কোনো মূর্তি নেই, তবু চোখ সেখানেই আটকে যায়। শূন্যতাও যে এত ভারী হতে পারে, সেটা এখানে এসে বুঝলাম। মনে হচ্ছিল, যেন পাহাড় নিজেই কিছু হারানোর কষ্ট বহন করছে।

আমার বন্ধু বললেন, এই মূর্তিগুলো সম্ভবত কুষাণ যুগে তৈরি। রাজা কনিষ্কের সময়ে। কুষাণরা শুধু শাসক ছিল না, তারা ছিল সভ্যতার বাহক। ভারত, পারস্য, মধ্য এশিয়া—সবকিছুর একটা সংযোগ ছিল তাদের মধ্যে। বামিয়ান তখন কোনো প্রান্তিক এলাকা ছিল না। এটা ছিল সিল্ক রোডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নিচ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাফেলা যেত, উটের ঘণ্টার শব্দ শোনা যেত, আর পাহাড়ের গুহায় বসে ভিক্ষুরা ধ্যান করতেন। এই উপত্যকা একসময় জীবন্ত ছিল—ধর্ম, বাণিজ্য, শিল্প, চিন্তার মিলনস্থল।

তিনি খুব স্পষ্ট করে বললেন, তালিবানই প্রথম নয় যারা বামিয়ান বুদ্ধ ধ্বংস করেছে। এই কথা শুনে প্রথমে একটু অবাক হলেও, পরে বুঝলাম ইতিহাস আসলে কত নির্মমভাবে পুনরাবৃত্ত হয়। চেঙ্গিস খানের সময় পুরো বামিয়ান শহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মানুষ হত্যা হয়েছিল, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় থেকে বামিয়ান “চিৎকারের শহর” নামে পরিচিত হয়েছিল। তারও পরে বিভিন্ন শাসকের আমলে এই মূর্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঔরঙ্গজেবের সময় কামান দাগা হয়েছিল। কিন্তু তবুও, শত শত বছর ধরে এই মূর্তিগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। ভেঙেছে, আবার মেরামত হয়েছে। স্থানীয় মানুষই এগুলোকে আগলে রেখেছে।

এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি বারবার ওই ফাঁকা কুলুঙ্গির দিকে তাকাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, মূর্তিগুলো নেই, কিন্তু তাদের ইতিহাস এখনও বাতাসে ভাসছে। ধ্বংস করা যায় পাথর, কিন্তু স্মৃতি নয়।

তারপর আমরা পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা গুহাগুলোর দিকে গেলাম। বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই একেবারে অন্য জগৎ। আলো কম, ঠান্ডা পাথরের দেয়াল, আর দেওয়ালে এখনও কিছু রঙের চিহ্ন দেখা যায়। আমার বন্ধু টর্চ জ্বালিয়ে দেখালেন কোথায় কী ছিল। কোথাও লাল, কোথাও নীল, কোথাও হলুদের ছাপ। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—কিছু জায়গায় এখনও সোনার আস্তরণের হালকা চিহ্ন দেখা যায়।

তিনি বললেন, এই সোনা শুধু সৌন্দর্যের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। ধ্যানের সময় আলো প্রতিফলিত করার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই গুহাগুলো ছিল ধ্যানকক্ষ। এখানে বসে ভিক্ষুরা ধ্যান করতেন, মন্ত্র জপ করতেন। তেলের প্রদীপ জ্বলত, দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলো সেই আলোতে আলাদা করে ফুটে উঠত। চোখ বন্ধ করলে এখনও যেন সেই দৃশ্য কল্পনা করা যায়।

আমি খুব সাবধানে দেওয়ালে হাত রাখলাম। মনে হচ্ছিল, এই পাথরের মধ্যে শুধু খোদাই নয়, মানুষের নিঃশ্বাস জমে আছে। কত মানুষ এখানে বসেছে, কত চিন্তা, কত প্রার্থনা এই দেয়ালের ভেতর দিয়ে গেছে—এই সবকিছু একসঙ্গে অনুভব করা যায়।

আমার বন্ধু বললেন, বামিয়ানের ইতিহাস আসলে স্তরে স্তরে জমে আছে। এখানে নতুন কিছু তৈরি করতে গিয়ে পুরনোটা মুছে ফেলা হয়নি। একের ওপর এক ইতিহাস বসেছে। এটাই বামিয়ানকে আলাদা করে।

এরপর আমরা সেই সিঁড়িগুলো বেয়ে উঠতে শুরু করলাম, যেগুলো পাহাড় কেটে তৈরি। সিঁড়িগুলো খুব সরু, অসমতল, আর খাড়া। উঠতে উঠতে শ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। কিন্তু থামতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল, প্রতিটা ধাপ আমাকে সময়ের ভেতর আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত যখন ওপরে পৌঁছালাম, তখন সামনে যে দৃশ্যটা খুলে গেল, সেটা ভাষায় বোঝানো কঠিন। পুরো বামিয়ান উপত্যকা চোখের সামনে। মাঠ, জলধারা, ছোট ছোট ঘর, দূরে পাহাড়। কিন্তু এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ একটা উপলব্ধি হলো—বেশিরভাগ মানুষ বামিয়ান বুদ্ধকে দেখেছে, কিন্তু খুব কম মানুষ দেখেছে পৃথিবীকে বামিয়ান বুদ্ধের চোখ দিয়ে। আমি তখন ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেই উচ্চতায়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে উপত্যকাকে দেখছিলাম, যেভাবে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বুদ্ধ এই পৃথিবীকে দেখেছে।

দূরে তুষারঢাকা Hindu Kush পর্বতমালার শিখরগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বরফে ঢাকা পাহাড়গুলো সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে ঝলমল করছিল। নিচে শান্ত উপত্যকা, উপরে অসীম আকাশ—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এটা শুধু সুন্দর নয়, এটা স্বর্গীয়। বাতাস ছিল ঠান্ডা, নির্মল, এমন এক ধরনের পবিত্রতা যেন তার মধ্যে মিশে আছে। মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য দেখেই বুদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল, ঋতু বদলাতে দেখেছে, মানুষের আসা-যাওয়া দেখেছে, যুদ্ধ আর শান্তি—সবকিছু নীরবে প্রত্যক্ষ করেছে।

সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে অসম্ভব ভাগ্যবান মনে করলাম। ইতিহাসের এত কাছে এসে, ইতিহাসের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার সুযোগ খুব কম মানুষই পায়। আমার চোখ ভিজে উঠেছিল, কিন্তু সেটা দুঃখে নয়—এক গভীর কৃতজ্ঞতায়। বামিয়ান বুদ্ধ আজ নেই, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বেঁচে আছে, আর সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে পৃথিবীকে দেখার সৌভাগ্য আমি পেয়েছিলাম।

নামতে নামতে চারপাশে হাযারা মানুষদের দৈনন্দিন জীবন চোখে পড়ছিল। কেউ মাঠে কাজ করছে, কেউ বাজারের দিকে যাচ্ছে, কেউ স্কুল থেকে ফিরছে। এত ইতিহাস, এত রক্তপাতের পরেও জীবন এখানে থেমে থাকেনি। এই মানুষগুলোই বামিয়ানের আসল উত্তরাধিকার।

আমার মনে হলো, বামিয়ান বুদ্ধ আসলে শুধু একটা মূর্তি ছিল না। এটা ছিল এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। সেটা ভাঙার চেষ্টা বহুবার হয়েছে। কিন্তু আজও বামিয়ান দাঁড়িয়ে আছে—ক্ষত নিয়ে, স্মৃতি নিয়ে, আর মানুষের জীবন নিয়ে।

বামিয়ান থেকে ফেরার সময় আমি বুঝলাম, আমি কোনো ধ্বংসাবশেষ দেখিনি। আমি দেখেছি টিকে থাকার গল্প। এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়, এটা আমার জন্য এক ধরনের সাক্ষ্য—মানুষ কীভাবে ইতিহাসের ভার নিয়ে বাঁচে, আর কীভাবে ধ্বংসের মাঝেও জীবন খুঁজে নেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *