Journey to Ancient Bacteria/Balkh

গজনি থেকে কাবুল ফেরার সময় শরীরটা ভালো ছিল না। হালকা জ্বর, মাথার ভেতর চাপ, বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত শূন্যতা। গজনি এমন একটা জায়গা—যেটা শুধু চোখে দেখে শেষ করা যায় না। ওখানে দাঁড়ালে ইতিহাস শুধু সামনে থাকে না, শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঠান্ডা হাওয়া, ভাঙা মিনার, যুদ্ধের ক্ষত আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা স্মৃতি—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, শরীরের শক্তির সঙ্গে সঙ্গে মনটাও যেন একটু একটু করে খালি হয়ে যাচ্ছে।

সেই অবস্থায়ই বুঝলাম, আফগানিস্তানের দক্ষিণ দিকে আর যাওয়া ঠিক হবে না। নানগরহার, তোরখাম সীমান্তের দিক, আর তার আশেপাশের প্রদেশগুলো তখন টিটিপি আর আইএসআইএস-এর প্রভাবাধীন। এই সিদ্ধান্তটা কোনো নাটকীয় ভয় থেকে নেওয়া নয়। এটা হিসেব করা সিদ্ধান্ত। ভ্রমণে সবসময় “আরও এক ধাপ এগোনো” সাহস নয়—কখনও কখনও থেমে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি সেটা মেনে নিলাম।

তাই কাবুল থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম—এবার উত্তর দিকে।

কাবুল থেকে মাজার-এ-শরীফ।

এই যাত্রাটাই হবে আফগানিস্তানে আমার শেষ অধ্যায়।

প্লেনে উঠেই জানালার পাশের সিটটা বেছে নিয়েছিলাম। শরীর খারাপ থাকলেও জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। প্লেন যখন ধীরে ধীরে কাবুল ছাড়ল, নিচে ছড়িয়ে পড়ল হিন্দুকুশ পর্বতমালা। আকাশ থেকে পাহাড়গুলো একেবারে অন্যরকম লাগে—নীরব, কঠিন, নির্লিপ্ত। কোথাও ধারালো শিরা, কোথাও গভীর খাদ, কোথাও দূরে দূরে তুষার জমে থাকা চূড়া। এই পাহাড়গুলো যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিলাম—এই পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক গঠন নয়। এরা ইতিহাসের সাক্ষী। কত সেনাবাহিনী, কত সম্রাট, কত বণিক, কত সাধু, কত শরণার্থী এই পথ পেরিয়েছে। আলেকজান্ডারের সৈন্যরা, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা, পারস্যের পুরোহিতেরা, মধ্য এশিয়ার কাফেলা—সবাই এই পাহাড় দেখেছে। পাহাড় দেখেছে সবাইকে, কিন্তু পাহাড় কাউকে মনে রাখেনি। পাহাড় শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছে।

এই আকাশ থেকে দেখার মুহূর্তটা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আমি জানতাম—আমি শুধু একটা শহরে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি এমন এক ভূখণ্ডে, যার নাম হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে।

প্লেন নামল মাজার-এ-শরীফে।

বিমানবন্দর ছোট, সাধারণ। কোনো ঝলমলে কিছু নেই। বাইরে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই একটা অস্বস্তি টের পেলাম—ভাষা। ট্যাক্সিওয়ালারা ঘিরে ধরল, সবাই দ্রুত দারি-ফারসিতে কথা বলছে। কেউ উর্দু জানে না, কেউ ইংরেজিও না। আমি চেষ্টা করলাম—ভাঙা ফারসিতে কিছু বলার। “হোটেল… শহরের ভেতর… ব্লু মসজিদের কাছে।”

কেউ বুঝছে, কেউ বুঝছে না। দাম বলা হচ্ছে, কিন্তু এত দ্রুত যে সংখ্যাটাই ধরতে পারছি না। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। এই প্রথম আফগানিস্তানে নিজেকে সত্যিকারের একা মনে হল। কাবুলে কিছুটা উর্দু চলত, কিছুটা ইংরেজি। এখানে না।

শেষ পর্যন্ত এক মাঝবয়সি লোক এগিয়ে এল। সে বেশি কথা বলল না। শুধু হাত ইশারায় বুঝিয়ে দিল—চলুন। কীভাবে যেন ভাড়া ঠিক হল। আমি আর জিজ্ঞেস করিনি। গাড়িতে উঠে বসলাম।

শহরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে একটা পার্থক্য চোখে পড়ল। মাজার-এ-শরীফ কাবুলের মতো টানটান নয়। এখানে উত্তেজনা কম। রাস্তা চওড়া, ট্রাফিক ধীর। দোকানের সামনে মানুষ বসে চা খাচ্ছে, ফলের দোকানে তরমুজ কাটা হচ্ছে, কোথাও সেলাইয়ের দোকানে মেশিনের একটানা শব্দ। এটা একটা শহর, যেটা যুদ্ধের মধ্যেও নিজের দৈনন্দিন জীবন বানিয়ে নিয়েছে।

হোটেলটা নিলাম ব্লু মসজিদের কাছেই। নীল গম্বুজ দূর থেকে দেখা যায়। ব্যাগ নামিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। শরীরটা খুবই ক্লান্ত ছিল। ঠিক করলাম—আজই মসজিদে যাব না। এমন জায়গায় তাড়াহুড়ো করা ঠিক না। আগে যাব বাল্খ।

কারণ আমার মাথার ভেতর তখন ঘুরছে একটাই লাইন—

বাল্খ: মহাভারতের ধুলোয় ঢাকা এক রাজ্য।

এই লাইনটা কোনো নাটকীয় শিরোনাম নয়। এটা একটা অনুভূতি।

মহাভারত আমাদের কাছে শুধু গল্প নয়। এটা একটা চলমান স্মৃতি। তার মধ্যেই বহলিক—শান্তনুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। হস্তিনাপুরের সিংহাসনের দাবি ছেড়ে দিয়ে তিনি উত্তর দিকে যে রাজ্য পেয়েছিলেন, সেই রাজ্যটাই আমাকে টানছিল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে লড়েছিলেন, চতুর্দশ দিনে নিহত হন। কিন্তু প্রশ্নটা ছিল—এই রাজ্যটা কোথায়?

ধর্মীয় আবেগ নয়, ভৌগোলিক কৌতূহল আমাকে টেনেছিল। কারণ নাম বদলায়, শাসক বদলায়—কিন্তু জমি ভুলে না।

মাজার-এ-শরীফ থেকে বাল্খের দিকে যাওয়ার রাস্তা খুব সাধারণ। চারপাশে ক্ষেত, মাটির বাড়ি, খোলা আকাশ। কোথাও কোনো বিশাল ধ্বংসস্তূপ নেই। প্রথমে মনে হল—এখানে কিছুই নেই।

আর ঠিক সেই ভাবনাটাই আমাকে অস্বস্তিতে ফেলল।

কারণ এই বাল্খই সেই জায়গা—যাকে গ্রিকরা বলত Bactra, পারসিকরা বলত Bakhdi বা Zariaspa, আর আরবরা ডাকত Umm al-Bilad—শহরের জননী। বহু ঐতিহাসিক আর প্রাচীন সূত্রের মতে, এই অঞ্চলই কখনও কখনও জরথুস্ত্রের জন্মস্থান বা অন্তত তার কর্মক্ষেত্র হিসেবে ধরা হয়, আবার কারও মতে তিনি এখানে শিক্ষা দিয়েছেন—এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছে জরথুস্ত্রবাদী দর্শনের অনেক বীজ। এই অঞ্চলের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে জালালউদ্দিন রুমি—জালালউদ্দিন মুহাম্মদ বাল্খি। এখানেই আলেকজান্ডার দুর্গ বানিয়েছিলেন, এখানকারই বাখত্রীয় অভিজাত অক্সিয়ার্টেসের কন্যা রুকসানাকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। কুষাণ যুগে এখানে বৌদ্ধ স্তূপ দাঁড়িয়েছিল, বাল্খ তখন বৌদ্ধ শিক্ষার এক বড় কেন্দ্র ছিল। এত ইতিহাস—আর আজ এক নীরব গ্রাম।

আমি বুঝতে পারছিলাম—বাল্খ চোখে ধরা দেয় না। বাল্খ অনুভব করতে হয়। মাজার-এ-শরীফ থেকে বাল্খের দিকে যেতে যেতে আমার মনে হচ্ছিল, আমি কোনো শহরের দিকে এগোচ্ছি না—আমি এগোচ্ছি সময়ের ভেতরে। রাস্তার দু’পাশে যতদূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ সমতল জমি। কোথাও আলুর ক্ষেত, কোথাও শুকনো মাটি, কোথাও ছোট ছোট গ্রাম। কোনো পর্যটন বোর্ড নেই, কোনো “ঐতিহাসিক স্থান” লেখা সাইনবোর্ড নেই। যদি কেউ না জানে, তাহলে এই রাস্তায় চলতে চলতে কখনোই বুঝবে না—এই পথের নিচে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস চাপা পড়ে আছে।

এইখানেই হয়তো বাল্খের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

এটা নিজেকে দেখায় না।

এটা নিজেকে চাপিয়ে দেয় না।

মনে পড়ছিল মহাভারতের সেই অংশগুলো—যেখানে বহলিকের নাম আসে বারবার। শান্তনুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। হস্তিনাপুরের সিংহাসনের প্রকৃত দাবিদার হয়েও যিনি তা ত্যাগ করেছিলেন। উত্তর দিকে যে রাজ্য পেয়েছিলেন, সেই রাজ্যের নাম বহলিক। এই বহলিক কি শুধুই কাব্যের চরিত্র? নাকি কোনো বাস্তব ভূখণ্ডের স্মৃতি?

ভৌগোলিক যুক্তি খুব স্পষ্ট। হিন্দুকুশের উত্তরে, মধ্য এশিয়ার দিকে—এই অঞ্চল প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে সবসময় “উত্তরাপথ” নামে পরিচিত। বাণিজ্যপথ, ধর্মপথ, সংস্কৃতির স্রোত—সবই এই পথ দিয়ে চলাচল করেছে। কাজেই বহলিক যদি কোনো বাস্তব রাজ্য হয়ে থাকে, তাহলে তার অবস্থান এখানেই হওয়ার কথা।

গাড়ি থামল।

“বাল্খ,” ড্রাইভার বলল।

আমি চারদিকে তাকালাম।

একটা গ্রাম।

সাধারণ।

নীরব।

এই কি সেই বাল্খ?

যে বাল্খকে গ্রিকরা বলত Bactra, পারসিকরা বলত Bakhdi, আর আরবরা বলত Umm al-Bilad—শহরের জননী? যে বাল্খের নাম শুনে পারস্য, গ্রিস, ভারত, চীন—সব সভ্যতার ইতিহাস একসাথে জেগে ওঠে?

প্রথমে মনে হল, হয়তো ভুল জায়গায় এসেছি।

তারপর বুঝলাম—ভুল আমি করছি।

আমি খুঁজছি দৃশ্যমান ধ্বংসাবশেষ।

বাল্খ লুকিয়ে আছে স্তরের ভেতরে।

এই প্রদেশের ইতিহাস কেবল ইসলামী নয়। বরং ইসলামের অনেক আগের ইতিহাসই এখানে সবচেয়ে গভীর। বহু ঐতিহাসিকের মতে এবং প্রচলিত বিশ্বাসে, এই অঞ্চলেই জন্মেছেন বা অন্তত শিক্ষা দিয়েছেন জরথুস্ত্র—জরথুস্ত্রবাদ ধর্মের প্রবর্তক। আগুনকে পবিত্র শক্তি হিসেবে দেখা, সত্য আর মিথ্যার দ্বন্দ্ব—এই দর্শনের জন্ম এই মাটিতেই বলে মানা হয়। পরে সেই ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে পারস্য জুড়ে।

এরপর আসে বৌদ্ধ যুগ। কুষাণ সাম্রাজ্যের সময় বাল্খ ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। এখানকার বৌদ্ধ স্তূপগুলোর কথা বহু গ্রন্থে লেখা আছে। যদিও আজ তার বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে, কিছু এখনো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। আমি জানতাম, কাছেই একটি প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ আছে। যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে রাস্তা বন্ধ ছিল। দূর থেকেই জায়গাটা দেখাল ড্রাইভার। যেতে পারিনি। অদ্ভুতভাবে সেই না-পারাটাও খুব মানানসই লাগছিল। বাল্খ সব কিছু একসাথে দেয় না।

এরপর আসে গ্রিক অধ্যায়। আলেকজান্ডার এখানে এসেছিলেন। দুর্গ বানিয়েছিলেন। এই অঞ্চলে অবস্থানকালে তিনি বাখত্রীয় অভিজাত পরিবারের কন্যা রুকসানাকে বিয়ে করেছিলেন—যাকে ইতিহাসে রোক্সানা নামেও চিনি। গ্রিক সংস্কৃতি আর মধ্য এশীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ এখান থেকেই শুরু হয়।

আর তারপর—রুমি।

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ বাল্খি।

নামের মধ্যেই শহরের পরিচয়।

এত স্তর, এত ইতিহাস—আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সাধারণ গ্রাম।

এই ভাবনাগুলোর মধ্যেই পৌঁছালাম হাজি পিয়াদা।

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, একটা ভাঙা কাঠামো। মাটির দেয়াল, তার ওপরে একটা ছাউনি—বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য। কাছে যেতেই কয়েকজন তালিবান যোদ্ধা আমাকে থামাল। খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন—কে আমি, কেন এসেছি, কোথা থেকে এসেছি।

আমি শান্তভাবে উত্তর দিলাম। কথা এগোতে থাকল। কয়েক মিনিট পর এক জন এগিয়ে এল, সে উর্দু বোঝে। কথাবার্তার গতি বদলে গেল। সে জানতে চাইলো, আমি কেন এই জায়গা দেখতে এসেছি। আমি বললাম—ইতিহাস দেখতে।

তার চোখে তখন কৌতূহল।

সে নিজেই বলল, “চলুন, আমি দেখাই।”

ভেতরে ঢুকে প্রথমেই যেটা অনুভব করলাম—এটা কোনো সাধারণ মসজিদ নয়। ইসলামী স্থাপত্যে যেসব খিলান, গম্বুজ, অলঙ্করণ থাকে—তার কিছুই নেই। দেয়ালের গঠন, স্তম্ভের অবস্থান—সবই আলাদা।

আমি জিজ্ঞেস করতেই সে কোনো দ্বিধা না করে বলল,

“ইসলামের আগে এই জায়গা ছিল। এখানে মানুষ পূজা করত। পরে মসজিদ হয়েছে।”

এই কথাটা সে এমন স্বাভাবিকভাবে বলল, যেন এটা কোনো বিতর্কের বিষয়ই নয়। গবেষকরাও এই স্থাপনাটিকে আফগানিস্তানের প্রাচীনতম ইসলামিক স্থাপত্যগুলোর একটি হিসেবে দেখেন, আবার এর নকশায় আগের যুগের প্রভাব খোঁজেন।

আমি তখন বুঝে গিয়েছিলাম—আমি একটি প্রাক-ইসলামিক ধর্মস্থানের ধারাবাহিকতার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি, যা পরবর্তীতে মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছে। সম্ভবত একটি প্রাচীন মন্দির বা পূজাস্থল ছিল, যদিও আজ আর নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু স্থাপত্যের ভেতরে আমার চোখে উত্তর ভারতীয় আর প্রাচীন ইরানী ছাপ মিলেমিশে থাকা খুব স্পষ্ট লাগছিল।

সে বলল, সে এখানেই বড় হয়েছে। তার বাপ-দাদারা বলত—এই জায়গা তিন হাজার বছরেরও পুরোনো। সে কথাটা বারবার বলছিল, যেন জোর দিয়ে বিশ্বাস করাতে চাইছে—

“বহুত বহুত তারিখি জাগা হ্যায়।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখন কি এখানে নামাজ পড়া হয়?

সে মাথা নাড়ল।

“না। এখানে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। এটা আর মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।”

এই “নিষিদ্ধ” শব্দটা আমাকে নাড়া দিল।

ধ্বংস করা হয়নি।

মুছে ফেলা হয়নি।

শুধু থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

হাজি পিয়াদার সেই ভাঙা কাঠামোর ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। তালিবান যোদ্ধাটাও কিছু বলছিল না। যেন দু’জনেই বুঝে গিয়েছিলাম—এই জায়গায় কথা কম, অনুভব বেশি দরকার। মাটির দেয়ালে হাত বুলিয়ে দেখছিলাম। মাটি ঠান্ডা, কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা সময়ের উষ্ণতা আলাদা। কত মানুষ এখানে এসেছে, কত বিশ্বাস এখানে জন্মেছে, আবার কত বিশ্বাস বদলে গেছে—সবকিছুর সাক্ষী এই নীরব দেয়ালগুলো।

হঠাৎ সে বলল,

“আরেকটা জায়গা দেখাব?”

আমি মাথা নাড়লাম।

আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। বাল্খের বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ—শুকনো মাটি, পুরনো ঘাস, আর রোদে পোড়া ইটের মিশ্রণ। রাস্তার ধারে দু-একটা ছাগল চরছে, দূরে কিছু শিশু খেলছে। এই সব দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল—এই তো একটা সাধারণ গ্রাম। কিন্তু জানতাম, এই সাধারণতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ ইতিহাস।

সে আমাকে নিয়ে গেল এক ছোট্ট সমাধির সামনে।

“রুকসানা,” সে বলল।

আলেকজান্ডারের স্ত্রী।

একজন গ্রিক বিজেতা, যে অর্ধেক পৃথিবী জয় করেছিল, আর এই মাটিতেই এক স্থানীয় নারীর সঙ্গে সংসার গড়েছিল। সমাধিটা খুব সাধারণ। কোনো রাজকীয় চিহ্ন নেই। মাটির কবর, তার ওপর কিছু কাপড় বাঁধা, শুকনো ফুল, কোথাও কোথাও মোমবাতির গলিত দাগ।

সে বলল, “লোকজন এখানে আসে, বিশেষ করে কেউ অসুস্থ হলে।”

আমি অবাক হইনি। মধ্য এশিয়ায় কবরের কাছে প্রার্থনা নতুন কিছু নয়। এটা ইসলামের মূলধারার অংশ না হলেও, এই অঞ্চলের সংস্কৃতির গভীরে ঢুকে গেছে—হয়তো গ্রিক প্রভাব, হয়তো আরও পুরনো স্থানীয় বিশ্বাস থেকে। ধর্ম বদলেছে, ভাষা বদলেছে—কিন্তু মানুষের অসহায়তা বদলায়নি। অসুখে পড়লে আজও মানুষ ইতিহাসের কাছে মাথা ঝোঁকায়।

এরপর আমরা গেলাম বাল্খের প্রাচীন দুর্গ আর প্রাচীরের দিকে—যেটাকে সবাই আলেকজান্ডারের দুর্গ বলে চেনে। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে খুব বেশি কিছু দেখা নয়। শুধু একটা উঁচু মাটির ঢিবি, আর কিছু ভেঙে পড়া দেয়াল। কিন্তু ওই দেয়ালের ওপর উঠলে দৃশ্যটা বদলে যায়।

আমরা উঠলাম।

চারদিকে যতদূর চোখ যায়—বাল্খ। নিচে ক্ষেত, ছোট ছোট ঘর, দূরে রাস্তা। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আলোটা লালচে, শান্ত। সেই মুহূর্তে আমার মাথায় একটাই ভাব এল—এই একই সূর্যাস্ত হয়তো আলেকজান্ডারও দেখেছিল। হয়তো ঠিক এই জায়গা থেকেই। সে হয়তো ভেবেছিল, এই শহর জয় হয়ে গেছে। কিন্তু আজ দাঁড়িয়ে বুঝলাম—কেউ বাল্খকে জয় করতে পারেনি। সবাই শুধু এসে গেছে, আবার চলে গেছে।

এই সময় কয়েকজন কিশোর আমাদের দিকে এগিয়ে এল। ওরা বাল্খি ভাষায় কথা বলছিল। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তালিবান যোদ্ধাটি হেসে বলল, ওরা জানতে চাইছে—আমি কোথা থেকে এসেছি।

“ভারত,” শুনে ওদের চোখ বড় হয়ে গেল।

ওরা কখনও কোনো ভারতীয় দেখেনি। শুধু শুনেছে। প্রশ্ন আসতে লাগল—কেন এসেছি, এখানে কী দেখছি, এত দূর থেকে কেন বাল্খে এলাম। সেই কিশোরদের কৌতূহলটা খুব খাঁটি ছিল। কোনো রাজনীতি নেই, কোনো ধারণা নেই—শুধু বিস্ময়।

আমি ভাবছিলাম—এই কিশোররাও একদিন ইতিহাসের অংশ হবে। হয়তো তাদের নাম কেউ জানবে না। কিন্তু তারা এই ভূমির ধারক।

ফেরার আগে তালিবান যোদ্ধাটি বলল,

“আরেকটা জায়গা দেখাব।”

আমরা গেলাম একটি ভাঙা কাঠামোর সামনে। মাটির দেয়াল, ফাটল ধরা, কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে—এটা আর পাঁচটা পরিত্যক্ত বাড়ির মতোই।

সে বলল,

“রুমির বাড়ি।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

জালালউদ্দিন রুমি—যার কবিতা আমাকে বহুবার নাড়া দিয়েছে, যার কথায় আমি পথ পেয়েছি, প্রশ্ন পেয়েছি। তার শিকড় এই মাটিতে। এই ভাঙা দেয়ালের মধ্যে। বাল্খেরই এক প্রান্ত থেকে সেই মানুষটা পরে কনিয়ায় গিয়েছিলেন, আর সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল তার শিক্ষা। হঠাৎ বুঝলাম—দর্শন কখনও প্রাসাদে জন্মায় না। দর্শন জন্মায় অনিশ্চয়তার মধ্যে, ভাঙনের মধ্যে, যাত্রার মধ্যে।

সে জানাল, তুরস্ক সরকার নাকি এই জায়গা সংরক্ষণের জন্য টাকা দিচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যতে কিছু হবে। হয়তো হবে না। বাল্খ খুব বেশি আশা দেয় না।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কাছাকাছি বৌদ্ধ স্তূপটার কথা। সে দেখিয়ে বলল—ওই দিকেই। কুষাণ যুগের। কিন্তু রাস্তা বন্ধ। নিরাপত্তার কারণে যাওয়া যায় না।

যেতে পারিনি।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই না-পারাটাও ঠিক লাগছিল। বাল্খ সব কিছু একসাথে দেয় না। কিছু ইতিহাস দূর থেকেই দেখা যায়।

ফেরার সময় সে আমাকে তার বাড়িতে ডিনারের জন্য ডাকল। আন্তরিক আমন্ত্রণ। আমি সত্যিই যেতে চাইছিলাম। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলে মাজার-এ-শরীফের রাস্তায় থাকা নিরাপদ নয়। আমি ভদ্রভাবে না করলাম। সে খারাপ মনে করল না।

মাজার-এ-শরীফে ফিরে আসতে আসতে অন্ধকার নামল। শরীরটা তখন আবার খারাপ লাগছিল। জ্বর বেড়েছে। কিন্তু শহরটা তখনও জেগে আছে। দোকান বন্ধ হচ্ছে, কোথাও চা ঢালা হচ্ছে, কোথাও নিচু গলায় কথা।

দূরে ব্লু মসজিদ আলোয় ভাসছিল। নীল গম্বুজ, সাদা আলো। শহরের মাঝখানে এক শান্ত উপস্থিতি।

সেই রাতে ঘরে বসে বারবার বাল্খের কথা ভাবছিলাম।

আমরা খুব সহজেই আজকাল প্রাচীন গ্রন্থকে “মিথ” বলে উড়িয়ে দিই। যুক্তি দিয়ে, আধুনিকতার দোহাই দিয়ে। কিন্তু যখন আপনি এই মাটিতে পা রাখেন, যখন দেখেন একটা নাম হাজার বছর ধরে টিকে আছে, যখন স্থানীয় মানুষের মুখে শোনেন এমন গল্প যা কোনো বই পড়ে শেখা নয়—তখন সন্দেহ জন্মায়।

হয়তো সব কল্পনা নয়।

হয়তো সব অলীক নয়।

হয়তো সেই গ্রন্থগুলো স্মৃতির আকারে কিছু সত্য বহন করেছিল। সেই স্মৃতি আজও বেঁচে আছে—মাটির গভীরে, মানুষের কথায়, শহরের নামে।

বাল্খ আমাকে কোনো উত্তর দেয়নি।

কিন্তু আমাকে থামিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্নের সামনে।

আর কখনও কখনও, ভ্রমণের আসল মানে সেখানেই—উত্তর পাওয়ায় নয়, প্রশ্ন বাঁচিয়ে রাখায়।

এইভাবেই বাল্খ আমার কাছে শুধু একটি শহর নয়—একটি অনুভূতি হয়ে রইল।

মহাভারতের ধুলোয় ঢাকা,

কিন্তু কখনও পুরোপুরি হারিয়ে না যাওয়া

এক রাজ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *